জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নীরব ঘাতক সাকার ফিশ। জলজ জীববৈচিত্র্য ক্ষতির আশংকা

একুরিয়ামে পালতে না পেরে উন্মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেওয়া যার অন্যতম কারণ।

লেখক

সাকার ফিশ কিংবা প্লেকো, একুরিয়াম হবির জগতে পরিচিত একটি মাছ। অনেকেই এমন ভূল ধারণায় বিশ্বাস করেন, এই মাছ একুরিয়ামের ময়লা পরিষ্কার করে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অকপটে উঠে এসেছে “বিরল প্রজাতির মাছ উন্মুক্ত জলাশয়ে” এই শিরোনামে। কিন্তু তা আসলেই কি বিরল? 

বাংলাদেশে একুরিয়ামে মাছপালনের চল শুরু হয় ১৯৮০ এর দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কাটাবন রোডে গুটিকয়েক দোকান নিয়ে শুরু হওয়া সে যাত্রা বর্তমানে প্রাণীপ্রেমী অনেকের কাছেই সুপরিচিত । রঙিন মাছ কিংবা পাখি কিনতে হলে ঢাকার মানুষ তো বটেই বিভিন্ন জেলা থেকেও ছুটে আসেন অনেক মানুষ । এই দীর্ঘ সময়ে যেমন বেড়েছে বাহারি মাছের কদর, সেই সাথে বেড়েছে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকাও।  একুরিয়ামের মাছ কেনো উন্মুক্ত জলাশয়ে ক্ষতিকর এ প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক  এবং গবেষক মুনতাসির আকাশ বলেন, ‘ যখন কোনো মাছ উন্মুক্ত জলাশয়ে ছাড়া পেয়ে পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়, তখন তাকে আখ্যায়িত করা হয় “ইনভেসিভ স্পিশিজ(Invasive species)” নামে । অন্যান্য মাছের সাথে খাদ্যের প্রতিযোগিতা করে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে যাওয়া যার অন্যরকম উদাহরণ। বাংলাদেশ তো বটেই, মাছটি বিস্তার লাভ করেছে প্রতিবেশি ভারত মায়ানমার সহ আরো বেশ কিছু দেশে।  ফলশ্রুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ জীবন। এই মাছের আগ্রাসী বৃদ্ধি থামাতে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে জারি করা হয়েছে রেড এলার্ট। 

Loricariidae ফ্যামিলির অন্তর্গত এই সাকার ফিশের রয়েছে প্রায় ৭০০ এর ও বেশি প্রজাতি। যাদের প্রধান নিবাস সাউথ আমেরিকা, পানামা ও কোস্টারিকার জলাশয়ে। বাংলাদেশে সবচে বেশি পাওয়া যায় এর   Pterygoplichthys pardalis প্রজাতি। একুরিয়ামের ময়লা খায় এমন ভুল ধারণায় জনপ্রিয় হওয়া মাছটি দেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে শৌখিন মাছপালকদের হাত ধরেই। একুরিয়ামে পালতে না পেরে উন্মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেওয়া যার অন্যতম কারণ। কিছুদিন আগেও কদাচিৎ দেখা পাওয়া যেত মাছটিকে, কিন্তু বর্তমানে যেনো নদীলে জাল ফেললেই উঠে আসছে এই মাছ এমনটাই জানিয়েছেন অনেক জেলেরা। তার প্রমাণ পাওয়া যায় সরেজমিনে তদন্ত করেও, সাভার ও ঢাকার আশেপাশের জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে পড়েছে মাছটি। ২০১৮ সালের একটি গবেষনায় “এম ইয়ামিন হোসেন” ও তার গবেষক দল বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেন এর প্রকৃতিতে এর প্রতক্ষ্য ক্ষতিকর দিক। উদ্ভিদ ও জলজ শেওলা ভোজী এ মাছটি প্রচুর পরিমানে বংশবৃদ্ধি করে ব্যহত করছে দেশি মাছের বিস্তার যারা প্রধানত জলজ উদ্ভিদ, পেরিফাইটন, খেয়ে জীবনধারণ করে। খাদ্য নিয়ে অসম এ লড়াইয়ে ক্রমশ হেরে যাচ্ছে দেশি মাছ। এই সাকার ফিশের দেহ শক্ত আইশ(Bony plates)  দিয়ে ঢাকা থাকার কারণে সহসা অন্য মাছের আক্রমণের শিকার হয় না। যার ফলে দিন দিন এরা হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য।  গবেষকদল ২০০৮,২০০৯  সালে গাইবান্ধা, রাজশাহী ,ঝিনাইদহ ও বগুড়ার নদী ও জলাশয় থেকে সংগ্রহ করেন এই মাছের নমুনা। কিন্তু বলা বাহুল্য  বর্তমানে এরা ছড়িয়ে পড়েছে অনেক জেলায়।  মৎস্য চাষের সঙ্গে জড়িত অনেকে অভিযোগ করেন পুকুরে কোনোভাবে চলে আসলে এদের কারণে তৈরি হয় খাদ্যসঙ্কট। বাধাগ্রস্ত হয় চাষকৃত মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি,  আগে যেখানে নদী, হাওড় বাওড়ে ধরা পড়ত প্রচুর ছোটবড় দেশি মাছ সেখানে এখন উল্লেখযোগ্য  হারে উপস্থিতি  বেড়েছে এই সাকার ফিশের। পার্শ্ব-পাখনায় শক্ত কাটার কারণে অনেক সময় মাছ ধরার জাল ছিড়ে যায় বলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন জেলেরা। বিদঘুটে চেহারার এই মাছের বাজারমূল্য নেই বলে কখনো বিক্রয় ও হয় না। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে Wildmentor উপস্থাপিত একটি আলোচনা সভায় কিভাবে এ মাছটির অবাধ বিস্তার বন্ধ করা যায় এ সম্পর্কে জানতে চাইলে  প্রফেসর ডঃ নিয়ামুল নাসের জানান, “এদের দেখামাত্রই অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেনো কোনোভাবেই প্রকৃতি তে পুনরায় ফিরে যেতে না পারে”  অভ্যন্তরীণ জলাশয় গুলোতে ঘন ঘন জাল টেনে কিংবা বিষ প্রয়োগ করে অপসারণ করা যেতে পারে। সাধারণ মানুষদের সচেতন করলে তারাও এদের অপসারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।  এই মাছ ফুড ফিশ হিসেবে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব কিনা সে সম্পর্কে জানতে চাইলে মুনতাসির আকাশ বলেন, “ সেটি হতে পারে একটি ভয়াবহ সিদ্ধান্ত,  এদের বিস্তার রোধে বিদেশে রপ্তানি শুরু করলে অনেকেই পুকুরে বানিজ্যিক ভাবে চাষ করতে পারেন, আর যদি তাই হয় তাহলে এদের বিস্তার রোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে”। 

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই মাছটি বিরল/ অতি দুর্লভ বলে যেসব শিরোনাম প্রচার করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণই ভুল।  বর্তমানে এটি কোনো বিরল শোভাবর্ধনকারী মাছ নয়, বরং এটি পরিনত হয়েছে জলজ জীববৈচিত্রের এক প্রতক্ষ্য শত্রুতে। মা মাছ ডিম দেবার পর তা দারুণ ভাবে আগলে রাখে অন্যান্য মাছেদের থেকে। যা প্রকৃতিতে এদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিটি দেশের জীববৈচিত্র্য সতন্ত্র, যা গড়ে ওঠে বহু সময়ের ব্যবধানে।  বর্তমামানে পরিবেশবিদদের ধারণা সুদূর আমাজন নদী অববাহিকার এ মাছের বিস্তার যদি এখনই রোধ করা না যায় তবে হুমকির মুখে পড়তে পারে জলজ বাস্তুতন্ত্র। শখ যেন পরিবেশের জন্য সংকট হয়ে না দাঁড়ায় তা এখন সময়ের দাবি।