Climate change refugee

জলবায়ু শরণার্থী, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বাংলাদেশ

জলবায়ু বর্তমান পৃথিবীর জন্য অভিশাপ স্বরূপ হয়ে দেখা দিয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ইত্যাদি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দেখা দিয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে নতুন কোন আশ্রয়ের খোঁজে। ফলাফল স্বরূপ এটি যেমন একদিকে আভ্যন্তরীণ শরণার্থীর পরিমাণ বৃদ্ধি করছে তেমনি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক শরণার্থী সমস্যার জন্ম দিবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কিন্তু সমস্যাটি মানব জাতিরই সৃষ্টি এবং এর পিছনে উন্নত বিশ্বের উপরই দায়িত্ব বেশী বর্তায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যকার দ্বন্দ্ব দিনে দিনে প্রকট আকার ধারণ করছে। এখানে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রধান আশংকার কারণ হচ্ছে ক্ষয়- ক্ষতি এবং সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ শরণার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে।

বিগত কয়েক বছরের দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাব যে এরকম বেশকিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশ তথা সারা পৃথিবীতেই হানা দিয়েছে। আইলা, সিডর এর মতো ঘূর্ণিঝড় তো বাংলাদেশের একাংশ প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছে। সুন্দরবনের কাছাকাছি এলাকায় পরিদর্শন করলে এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করা যায়। প্রাকৃতিক এই অর্থাৎ জলবায়ু সমস্যা তাই রাজনীতির একটি প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যায় বেশি জর্জরিত, স্বাভাবিক ভাবেই তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো। বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যায় ভারাক্রান্ত দরিদ্র দেশগুলোর জন্য এটি আরও চিন্তার কারণ। যেহেতু এর ফলে বিপুল পরিমাণ মানুষ শরণার্থীতে পরিণত হচ্ছে। উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর ফলে বিপুল পরিমাণ মানুষ তাদের বসত বাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে এবং ভবিষ্যত আরও হবে। কিভাবে তাদের পুনর্বাসন করা হবে তার কোন উত্তর এখনো কার কাছে নেই। বিশেষজ্ঞদের ধারণা পৃথিবীর উপকূলীয় স্থান সমূহে জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এসব দেশের উপকূল প্লাবিত হবে ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। বাংলাদেশ যেহেতু একটি উপকূলীয় দেশ তাই এদেশও এ সমস্যার সম্মুখিন। ধারণা করা হয় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী ৪০ বছরে বাংলাদেশের ২ কোটি মানুষ শরণার্থীতে পরিণত হবে যাদের জায়গা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা এ দেশে নেই। কিছু মানুষ শহরমুখী হবে বটে কিন্তু বাকিদের কোন গন্তব্য নেই।

আমরা যদি বাংলাদেশের আর কিছু বৈশিষ্টের দিকে লক্ষ্য করি তবে দেখতা পাব যে, এদেশের ৬০ শতাংশ ভূমিই সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটারেরও কম উচ্চতা সম্পন্ন (ব্রিটিশ গণমাধ্যমে প্রকাশ)। এদিকে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে সন্দ্বীপ, চট্রগ্রাম, কক্সবাজার এবং টেকনাফের সমুদ্র উপকূলের পানির উচ্চতা মেপে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের আশংকা পানির এ উচ্চতা আরও বাড়বে ফলে বাংলাদেশ বড় ধরণের হুমকির মুখে পড়বে। বিশ্বে ২০৫০ সাল নাগাদ যেখানে প্রতি ৪৫ জনে ১ জন জলবায়ু শরণার্থী হবে সেখানে বাংলাদেশে হবে প্রতি ৭ জনে ১ জন। এছাড়া নদী ভাঙ্গন, খরা ইত্যাদি নানা কারণে প্রচুর মানুষ তাদের ভূমি হারাচ্ছে বা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এদের বেশীর ভাগ ঢাকায় এসে বসতি গড়ে তুলেছে। ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে এখানে বাস করে ২৭৭০০ জন। ফলে এখানে স্থান সংকুলান করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এদেশে আর তেমন কোন শহর সেভাবে উন্নত হয়ে উঠেনি ফলে মানুষ ঢাকার উপর চাপ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আই ও আম) এর হিসাব অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তন জনিত প্রাকৃতিকই দুর্যোগ, নদী ভাঙ্গন সহ অন্যান্য কারণে প্রায় ১০ লক্ষ বাংলাদেশী আভ্যন্তরীণ শরণার্থীতে পরিণত হয়েছে। উপরন্তু মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে প্রায় ৪ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

জলবায়ুর আই পরিবর্তন জনিত সমস্যা বাংলাদেশের মতো সারা পৃথিবীকেই বেড়াতে হচ্ছে। বর্তমান শতকের মধ্যেই মালদ্বীপের মতো বেশকিছু দ্বীপ ও রাষ্ট্র সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ফলে আসব অঞ্চলের অধিবাসীদের পুনর্বাসিত করা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তাই সম্ভবত আগামী ৩০-৪০ বছরের মধ্যেই জলবায়ু শরণার্থী সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল আশংকা করছেন।

শরণার্থী বিষয়ক এই ইস্যু নিয়ে বর্তমানে বিশ্ব নেত্রীবৃন্দও সচেতন। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে গত ২০০৯ সালের ৭-১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় যা cop- 15 (15th conference of the parties) নামে পরিচিত। কিন্তু উন্নত বিশ্বের নেতারা বিষয়টিকে খুব সচেতন ভাবেই এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে। যেহেতু গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাব সেসব দেশে কম পড়বে। তাই ভৌগলিক ভাবে যেসব অঞ্চলে এর প্রভাব বেশী পরার আশংকা করা হচ্ছে (দেখা গেছে তাদের অধিকাংশই স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র) সেসব দেশই বেশী সোচ্চার। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ফোরামে অভিযোগ করেও খুব বেশী প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ জলবায়ু পরিবরতনের জন্য উন্নত বিশ্বই দায়ী। তাদের নিঃসৃত কার্বনের জন্যই আজ পৃথিবী এমন বিপদের সম্মুখীন। শিল্পে ক্ষতি হওয়ার আশংকায় তারা কার্বনের নিঃসরণ কমাতে রাজি হচ্ছে না। কোপেনহেগেন সম্মেলনে খসড়া প্রস্তাবে উল্লেখিত গ্রীণ হাউস নির্গমন হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চীন, ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক শিল্পোন্নত দেশ বিবাদে জড়িয়ে পরে। তারা কার্বন নিঃসরণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় কমাতে গড়িমসি করে। উল্টো তারা ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর উপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। কার্যত জলবায়ু ইস্যু নিয়ে শিল্পোন্নত এবং দরিদ্র দেশগুলো মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা ভাবা অবাস্তব হবে না যে অদূর ভবিষ্যতে এই ইস্যু পৃথিবীতে সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্থ দেশ হিসেবে দরিদ্র দেশ গুলোকেই এর সমাধানে এগিয়ে আস্তে হবে। তাদেরকে জোটবদ্ধ হতে হবে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে কেননা বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সব চেয়ে বেশী ক্ষতির সম্মুখীন। এক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে তাদের কাজ করতে হবে তা হল – প্রথমত, প্রচারণা অর্থাৎ বিশ্ব জনমত কে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সজাগ করে তোলা। দ্বিতীয়ত, সমস্যা জর্জরিত দেশগুলোকে নিয়ে জোট গঠন করা এবং জোটকে কার্যকরী করে তোলা। তৃতীয়ত, শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ(polluter pays) আদায় করা। ইতিমধ্যে উন্নত দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর প্রয়োজন মেটাতে ২০২০ সাল পর্যন্ত যৌথ ভাবে প্রতি বছর ১০০০ কোটি ডলার করে দিবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। গত বছর ব্রিটেনও বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে ১০০ কোটি ডলার প্রদান করার ঘোষণা দিয়েছে। এখানে দেখার বিষয় হল এ পরিমাণ অর্থ পর্যাপ্ত কিনা এবং আশ্বাস গুলো বাস্তবের মুখ দেখে কিনা। কেননা অতীতে এরকম অনেক আশ্বাসই আর পরে আলোর মুখ দেখেনি। চতুর্থত, কার্বন নিঃসরণ কমাতে গ্রীন ফুয়েল ব্যাবহার বাড়াতে প্রচারণা চালাতে হবে। পঞ্চমত, ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলের অভিবাসীদের নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসিত করা। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ব্যাবস্থাও করা যেতে পারে। রাশিয়া, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মত দেশ গুলো যেখানে জনবসতি খুব কম সেসব দেশে অভিবাসন বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে। মালদ্বীপ ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভবিষ্যত পৃথিবীতে জলবায়ু শরণার্থী ইস্যু একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই সমাধানের উপায়ও আমাদেরকে বের করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোকে এক্ষেত্রে দক্ষ কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে। চুপ করে বসে থাকলে নিজেরকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে সঁপে দেওয়ার সামিল হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর নিশ্চয়তা বিধান করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.