সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের বিকল্প নেই : অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী

সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে একটি পরিবেশ সমীক্ষা করেন। সুন্দরবন এবং রামপাল ইস্যু নিয়ে ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী কথা বলেছেন পরিবেশ বিষয়ক বাংলাদেশের প্রথম মাসিক অনলাইন ম্যাগাজিন GreenMagz.info এর সাথে। ব্লগার বন্ধুদের জন্যে সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরলাম।

সুন্দরবন ও রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে কথা বলছেন ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী

GreenMagz: স্যার আসসালামু আলাইকুম।

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: ওয়ালাইকুম আসসালাম।

GreenMagz: স্যার সম্প্রতি রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি হলো, একজন পরিবেশবিদ হিসেবে এ ব্যপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কি ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আসলে যেকোনো উন্নয়ন কাজের জন্য যৌথভাবে কাজ করতে গেলে তার একটা চুক্তি দরকার হয়, সেদিক থেকে দেখতে গেলে এটি ঠিক আছে । কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে চুক্তিটি করার আগে যেখানে এই পাওয়ার প্ল্যান্টটি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেই জায়গাটি সম্পর্কে ও তার আশেপাশের তার কি ধরণের প্রভাব পরবে, কোন ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা আছে কিনা এইসব বিষয়গুলি নিয়ে একটি পূর্নাঙ্গ এবং দীর্ঘমেয়াদী স্টাডি করার উচিৎ ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যদিও সরকারের আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল যে তারা এটা করবেনই , সেহেতু সে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করার জন্য সরকার অনেকটা তাড়াহুড়া করে এই প্রকল্পের কাজ শুরু করেছেন। আর এই প্রকল্পের পরিবেশ প্রতিক্রিয়া যাচাই বা ইআইএ করানো হয়েছে খোদ সরকারেরই একটি সংস্থা সিইজিআইএস এর মাধ্যমে । এটি সরকারের ওয়াটার রিসোর্স মিনিস্ট্রির আওতাধীন একটি প্রজেক্ট যা এই দপ্তরের একটি উইং হিসেবে কাজ করে মূলত সরকারের অভিপ্রায়গুলি বাস্তবায়নের জন্যে। একজন পরিবেশবিদ হিসেবে শুধু আমি নই অন্যান্য যারা এই ব্যাপারটা সম্পর্কে জ্ঞাত তাদের প্রত্যেকেরই বক্তব্য হচ্ছে যে, আমি একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব এই সিদ্ধান্তটি নিয়েই যদি পরিবেশ প্রতিক্রিয়া যাচাই করি অর্থাৎ আমাকে এটা করতেই হবে মনস্থির করে তার জন্যে একটা ইআইএ রিপোর্ট তৈরি করি তবে তার ফলাফল হবে একরকম। পক্ষান্তরে যদি পরিকল্পনাটি এমন হয় যে আমি আমার বাছাই করা একটি জায়গায় প্রকল্পটি করব কিন্তু তার পূর্বে পরিবেশ প্রতিক্রিয়া যাচাই বা ইআইএ করার পরে আমি এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিব , তবে সেই রিপোর্টের ফলাফল হবে অন্যরকম। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকার কোন পূর্নাঙ্গ স্টাডির আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে যেকোনো মূল্যেই তারা এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি করবেন। যদিও তারা মুখে বলছেন পরিবেশের ব্যপারটা তারা মাথায় রাখছেন কিন্তু আসলে পরিবেশটা তার কাছে মূখ্য নয় , এখানে মূখ্য হচ্ছে তার প্ল্যানটাকে এখানে প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং, এদিক থেকে এক কথায় বলা যায় যে , সরকার এবং এই পরিকল্পনার সাথে যারা যুক্ত আছেন তারা আন্তরিক নয় । তাই পরিবেশগত বিপর্যয় কি ধরণের ঘটবে সেটি যাচাই বাছাই না করেই তড়িঘড়ি করে এই কাজটি শুরু করেছেন।

GreenMagz: সিইজিআইএস এর রিপোর্ট সম্পর্কে আপনার মতামত কি ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: সিইজিআইএস এর ইআইএ রিপোর্টটার মধ্যে যে বিভিন্ন কারিগরি বিষয়গুলি থাকা উচিৎ সে জিনিসগুলি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি, ইআইএ রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে যে পার্শ্ববর্তী যে পশুর নদীতে জাহাজগুলি ল্যান্ড করবে বা ছোট ছোট কার্গো যেগুলো কয়লা নিয়ে আসবে বড় জাহাজ থেকে, এগুলি যেখানে অবস্থান করবে সেই পুরো এলাকাটি হচ্ছে ডলফিনের জন্যে একটি অভয়াশ্রম বা ব্রিডিং গ্রাউন্ড। এই ডলফিনগুলি বিশেষ ধরণের ডলফিন যারা মিষ্টি এবং লবণ পানির সংযোগস্থলে অবস্থান করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে তারা এই অভয়াশ্রমের কথা উল্লেখ করে সতর্কতার কথা বলেছেন কিন্তু এ ধরণের অভয়াশ্রম সংরক্ষণের জন্য কি ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে ব্যাপারে কোন দিকনির্দেশনা দেন নি। এই রিপোর্টের বহু জায়গায়, বহুক্ষেত্রে যেমন সুন্দরবনের ক্ষেত্রে কি ধরণের ক্ষতি হবে হবে এই ব্যাপারে চতুরতার সাথে একটা বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। বক্তব্যটি অনেকটা এরকম, যেহেতু কোস্টাল বেল্ট এবং এই অঞ্চলটি ঝড়-ঝঞ্জা ,ঘূর্ণিঝড় এবং সর্বোপরি একটি দুর্যোগপূর্ণ এলাকা সে কারনে এই প্রকল্পে কয়লা পোড়ানোর ফলে যে বায়ু দূষণ সহ অন্যান্য দূষণ হবে তা সুন্দরবনের দিকে না গিয়ে মূল ভূখণ্ডের দিকে চলে আসবে বা প্রশমন হয়ে যাবে। যার ফলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে তারা মন্তব্য করেছেন। এটা যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ হাস্যকর বলে মনে করবে। তাহলে সাইক্লোন বা ক্লাইমেট চেঞ্জের যে ব্যপারগুলি সেগুলি তো পরিবেশ দূষণের জন্যেই ঘটছে , পক্ষান্তরে আমরা বলছি এটি একটি ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকা , তাহলে আমরা কি কামনা করি যে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় হবে শুধুমাত্র এই কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারনে যেসকল দূষণ হবে সেগুলিকে শুধুমাত্র প্রশমন করার জন্যে ? যেকোনো একটি ইআইএ রিপোর্ট করতে গেলে তার একটা বেজ লাইন সার্ভে প্রয়োজন হয়, পূর্বে কি ছিল , পরবর্তী পাঁচ বা দশ বছর পর কি হবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেখানকার ভূমি এবং পারিপার্শ্বিক যে বিষয়গুলি উল্লেখ করা প্রয়োজন তার কিছুই এই রিপোর্টে করা হয়নি। তারা শুধুমাত্র একটি জিনিস করেছে আর তা হচ্ছে প্রকল্পের জন্য দুটি সম্ভাব্য স্থানের তুলনা, যার একটি লবণছড়া এবং আরেকটি রামপাল। লবণছড়ার চাইতে রামপালকে প্রকল্পের জন্য বেশী উপযোগী দেখানো হয়েছে কেননা লবণছড়ার আশেপাশে আবাসন,শিল্পায়ন, নগরায়ন আছে কিন্তু পক্ষান্তরে রামপালে তা কম। কিন্তু তারা এটি পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন যে এটি একটি জলাভূমি অঞ্চল যেখানে মানুষ মাছ চাষ করে, ধান, শাক সবজিসহ চাষ করে, সর্বোপরি পুরো এলাকাটি কৃষি জমি। যেখানে জনসংখ্যার চাপে কৃষিজমি এমনিতেই কমে যাচ্ছে সেখানে ১৮০০ একরের বেশী কৃষিজমি তারা অধিগ্রহণ করেছেন এবং ভবিষ্যতে তাদের আরও জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা আছে কয়লা নিয়ে এসে রাখার জন্যে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনার জন্যে । কিন্তু দুঃখজনক বিষয়টি হচ্ছে এর ফলে ভূ-প্রাকৃতিক যে পরিবর্তন হবে সেটি প্রশমনের ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে তার কোন দিকনির্দেশনার উল্লেখ এই রিপোর্টে নেই।

GreenMagz: আমরা জানি যে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আপনি একটি সমীক্ষা করেছেন, রামপাল নিয়ে নতুনভাবে পরিবেশ সমীক্ষা করার বিষয়ে আপনার মাঝে কোন ব্যপারটা কাজ করে, যেখানে সিইজিআইএস আগেই একটা সমীক্ষা করেছিল ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: সবচেয়ে দুঃখজনক হলেও সত্যি সিইজিআইএস এ যারা কাজ করছেন তাদেরকে অনেক সময় সরকার এর ইচ্ছা অনুযায়ী রিপোর্ট প্রদান করতে হয় কেননা তারা একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করছেন এবং এখানে প্রতিষ্ঠানের চাহিদাটাই তাদের কাছে মূখ্য । আমি মূলত যে কাজটি করেছি সেটি শুধুমাত্র আমার ব্যাক্তিগত উদ্যোগে। তাছাড়া আমি দীর্ঘদিন থেকে সাতক্ষীরা ,সুন্দরবন থেকে শুরু করে সেন্টমার্টিনের উপকূলীয় এলাকাতে কাজ করেছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরীরত অবস্থায় দীর্ঘদিন সেন্টমার্টিনে পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছি। এছাড়া জাপান এনএসকে টেলিভিশনে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগ প্রশমন কৌশল নিয়ে কাজ করছি, তারই ধারাবাহিকতায় আমরা দীর্ঘদিন ধরে রামপাল ও তার তৎসংলগ্ন এলাকা যেমন সুন্দরবন ,শরণখোলা , মংলা, কয়রা, দাকোপ, শ্যামনগর এসব এলাকায় কাজ করছি। আমাদের সেই কাজের অংশ হিসেবে আমরা দেখলাম যখন এখানে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে আর আমাদের হাতে যেহেতু দীর্ঘদিন থেকে এ বিষয়ে বেজলাইন ইবফরমেশন আছে সেহেতু আমরা একটা ইআইএ স্টাডি করতে পারি । এই স্টাডিটা শুধুমাত্র আমাদের একাডেমিক ইন্টারেস্ট থেকে করেছি এবং আমরা কারও কাছ থেকে এই ব্যাপারে কোন আর্থিক সহযোগিতা নেইনি। পরবর্তীতে আমরা যখন কাজ করছিলাম তখন বিভিন্ন পরিবেশ সংস্থা ও পরিবেশবিদ যারা আছেন তারা এ ব্যপারে খোঁজ- খবর নেন এবং আমরা তাদের এ বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করি। আমার কথা হচ্ছে যে আমাদের এই স্টাডিটাকেই গ্রহণ করতে হবে এমন নয়। সরকার এক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষজ্ঞ যারা আছেন তাদের সবাইকে নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি করে তাদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে পারত। কিন্তু সরকার নিজের কাজ নিজেই করেছেন, তাই আদৌ এর গ্রহণযোগ্যতা নেই। এবং সর্বশেষ আমার জানামতে সিইজিআইএস এর করা ইআইএ রিপোর্ট নিয়ে ঢাকায় যে মতবিনিময় সভা হয়েছিল তাতে শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশী বিশেষজ্ঞ এই রিপোর্টটিকে একটি ভোগাস রিপোর্ট হিসেবে উল্লেখ করেন যা পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়।

GreenMagz: আপনাদের করা পরিবেশ সমীক্ষা সম্পর্কে আমাদের জানাবেন কি ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আমাদের পরিবেশ সমীক্ষার ফলাফল ইতোমধ্যে অনেক পত্র-পত্রিকাতে ছাপা হয়েছে। আমরা আমাদের ইআইএ স্টাডিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রভাব যাচাইকারী উপাদান হিসেবে মূলত তিনভাগে ভাগ করেছি যেমনঃ প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং এর প্রভাব,জৈবিক পরিবেশ এবং এর প্রভাব, আর্থ-সামাজিক পরিবেশ এবং এর প্রভাব ।প্রভাবের ধরণকে আমরা চারভাগে ভাগ করেছি । উদাহরণস্বরূপ , S- Sustainable (টেকসই), SM- Sustainable with Mitigation (প্রশমনের মাধ্যম টেকসইযোগ্য), RM- Reversible with Mitigation (প্রশমনের মাধ্যমে পরিবর্তনীয়), IR- Irreversible (অপরিবর্তনীয়) । প্রভাব যাচাইকারী উপাদানগুলো বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দলের সাথে আলোচনা করে ঠিক করা হয়েছে। যখন কোন প্রভাব পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়নি তখন অভিজ্ঞতার আলোকে তা গুণগত উপায়ে বিশ্লেষণ করা হয়ছে। -১ থেকে -১০ এবং +১ থেকে +১০ পর্যন্ত মোট ২১ টি স্কেলে প্রভাবগুলো মূল্যায়ন করা হয়েছে যেখানে কোন প্রভাব না পড়াকে “০” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রভাব যাচাইকারী উপাদান একটি গুরুত্বপূর্ণ মান নিরূপনকারী যা নীতিনির্ধারকদের একটি প্রকল্পের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

GreenMagz: রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রাকৃতিক, জৈবিক , সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশের উপর কি ধরনের প্রভাব ফেলবে ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে । বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির বেশির ভাগই কৃষিজমি । ফলে এসকল কৃষিজমিসহ এ এলাকার ধান, মাছ, গৃহপালিত পশুপাখি ইত্যাদির উৎপাদন ধ্বংস হবে । এছাড়া বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি , বৃষ্টিপাত হ্রাস, বন্যা বা জলাবদ্ধতার প্রকোপ বৃদ্ধি, নদী ভাঙ্গনের আশঙ্কা বৃদ্ধি, ভূ-উপরিভাগ এবং ভূ-আভ্যন্তরীণ পানি দূষণ , ভূ-আভ্যন্তরীণ পানির স্তর হ্রাস, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণসহ বিভিন্ন ধরনের দূষণ দেখা দিবে ; এমনকি দীর্ঘদিনের দূষণের ফলে স্বল্প মাত্রায় এসিড বৃষ্টির মতো ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে।

একই সঙ্গে জৈবিক পরিবেশের উপরও বিপুল ধ্বংসাত্মক প্রভাব সৃষ্টি হবে। জোয়ার-ভাঁটা অধ্যুষ্যিত সুন্দরবন বনাঞ্চল নানা জাতের গাছ-গাছালি আর জীবজন্তুর সমাহারে পরিপূর্ণ। এখানে প্রায় ৬৬ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২০০ এর অধিক প্রজাতির মাছ, ৪২ রকমের স্তন্যপায়ী, ২৩৪ ধরণের পাখি, ৫১ ধরণের সরীসৃপ, ৮ রকমের উভচর, অসংখ্য অমেরুদন্ডী প্রাণী রয়েছে ,যার মধ্যে ৫ টি প্রজাতি বিলুপ্ত প্রায় । বিভিন্ন ধরণের নির্মাণ কাজ, ড্রেজিং, বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক ও তেল নি:সরণ ইত্যাদির ফলে পশুর ও মাইদারা নদী, সংযোগ খাল, জোয়ার-ভাটার প্লাবণ ভূমি ইত্যাদি এলাকার মৎস্য ও অন্যান্য জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সরকার এই পশুর এবং আন্ধারমানিক নদীর কিছু অংশ ডলফিনের অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূত ছাই বা স্লারি ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে কারণ এতে ক্ষতিকর সালফার এবং কার্বন ডাই অক্সাইডসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, রেডিয়াম ইত্যাদি মিশে থাকে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করা হবে। এর ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নি:সরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নি:সরণ ইত্যাদি পরিবেশ আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে ।

পাঁচ লক্ষ এর অধিক মানুষ জীবন-জীবিকা আর আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। সুন্দরবন ধ্বংস হলে তাই তাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিঃসৃত কঠিন এবং তরল বর্জ্য বিষাক্ত আর্সেনিক, মার্কারী, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম বহন করে। এই বিষাক্ত উপাদানগুলো খাবার পানিকে দূষিত করে ফেলতে পারে এবং সুন্দরবনের আশেপাশের এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের গুরূত্বপূর্ণ মানব অঙ্গ ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ডেঙ্গু , ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন পরজীবী বাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে পারে। দেশীয় কয়লার অপর্যাপ্ততার কারণে এ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ভারতীয় অংশের বিবেচনায় আমদানীকৃত কয়লার পরামর্শ এসেছে। এই সুযোগে ভারত থেকে নিম্ন মানের কয়লা আমদানি হতে পারে যা দূষণের মাত্রাকে আরও কয়েক গুণ বারিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সার্বিকভাবে আমাদের পরিবেশগত সমীক্ষা হতে আমরা দেখি যে কাঠামোগত, জৈবিক, সামাজিক এবং অথনৈতিক পরিবেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অধিকাংশ প্রভাবই ঋণাত্নক এবং অপরিবর্তনীয় (-৮১) যা কোনভাবেই প্রশমন করা যাবে না।

GreenMagz: সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে এই প্রকল্পে পরিবেশগত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে করা হচ্ছে । এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা হয় তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্নই আসে না । কেননা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন এই প্রকল্পের বিপজ্জনক সীমার মধ্যেই অবস্থিত। সুন্দরবন বিশ্বব্যাপী রামসার এলাকা হিসেবে স্বীকৃত এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রাকৃতিক সংরক্ষণ অঞ্চলেরও একটি অংশ। তাই বিশ্ব জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অঞ্চল হিসেবে এই এলাকায় এধরণের প্রকল্প হতে পারে না।তারা বলছেন যে এখানে সুপার ক্রিটিকাল পদ্ধতিতে কোল বেজড পাওয়ার প্ল্যান্ট করবেন কিন্তু যেই পদ্ধতিটি তারা আমাদের দেশে করতে চাচ্ছেন সেটি তারা তাদের নিজেদের দেশেই করতে পারেননি ।তারা পরীক্ষামূলকভাবে গুজরাট ও মধ্য প্রদেশের কয়েকটি রাজ্যে এটি শুরু করলেও তা স্থায়ী হয়নি। স্থানীয় লোকজনের আপত্তির মুখে সেটি বন্ধ করে দিতে তারা বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, স্বয়ং ইন্ডিয়ান এটমিক কমিশনের চেয়ারম্যান এই ধরণের প্রকল্পকে অতি উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছেন।অর্থাৎ বলা যায় একটা এক্সপেরিমেন্টাল প্রজেক্টের জন্যে আমরা সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাকে বেছে নিয়েছি। এছাড়াও এই রিপোর্টে বহু অসংগতি রয়েছে যার কিছু উদাহরণ ইতোপূর্বে আমি দিয়েছি।

GreenMagz: রামপাল ইস্যু নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বন বিভাগের কি দায়িত্ব বর্তায় ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আসলে মজার ব্যপার হচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর অথবা বন বিভাগে কর্মরত যাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে তারা কেউই ব্যাক্তিগতভাবে চান না এই প্রকল্পটি হোক। কিন্তু যেহেতু তারা একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তাই প্রশানিকভাবে তারা এর বিরুদ্ধে কথা বলতে অপারগ ।

GreenMagz: ভারতের ‘ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান অ্যাক্ট ১৯৭২’ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বাঘ বা হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জীববৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্যকোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। অর্থাৎ ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসিকে বাংলাদেশে সুন্দরবনের যত কাছে পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে, তার নিজ দেশ ভারতে হলে সেটা করতে পারতো না! এ ব্যাপারে আপনি কি বলবেন ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আমাদের দেশে বর্তমানে এইধরনের কোন আইন নেই আর যার সুযোগটা এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গরা নিয়েছেন। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ জীব বৈচিত্র সংরক্ষণে একটি আইনের খসড়া সরকার নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়রছে । আমি আশা করব এই আইনে জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে কঠোর বিধি যুক্ত হবে যেন সুন্দরবনসহ আমাদের দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ইত্যাদি সংরক্ষণের ব্যাপারটি সুনিশ্চিত হবে।

GreenMagz: কোল বেইসড পাওয়ার প্লান্ট থেকে যে ফ্লাইঅ্যাশ নির্গত হয় বলা হচ্ছে সেটি বানিজ্যিক ভবে অনেক মুল্যবান এবং সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে চাহিদা বাংলাদেশে ব্যাপক। কিন্তু এদিকে ফ্লাইঅ্যাশ এ অবস্থিত হেভি মেটাল একটি ক্ষতিকারক ধাতু ।এ ক্ষেত্রে কোনটিকে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: উৎপাদিত বর্জ্য ছাই বা ফ্লাইঅ্যাশ সিমন্টে কারখানা, ইট তৈরী ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পে ব্যাবহারের সম্ভাবনার কথা ইআইএ রিপোর্টে উল্লেখ থাকলেও আসলে কোন কারখানায় কিভাবে আদৌ এর ব্যবহার হবে সে সম্পর্কে নিশ্চিত কোন পরিকল্পনা করা হয়নি । উদাহরণ হিসেবে বড় পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেই উৎপন্ন ছাই এরই উপযুক্ত ব্যাবহার বাংলাদেশে হচ্ছে না। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত দৈনিক ৩০০ মেট্রিকটন বর্জ্য ছাই কোন সিমেন্ট কারখানায় ব্যাবহারের বদলে গর্ত করে জমা করে রেখে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে কেননা এই ছাই বাতাসে উড়ে, ছাই মিশ্রিত পানি চুইয়ে মাটির নীচে ও আশাপাশের জলাভূমিতে বিষাক্ত ভারী ধাতুর মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে।এমনকি এই প্রকল্পের উৎপাদিত কঠিন বর্জ্যের একটি অংশ প্রকল্প এলাকার নিচু জমি ভরাটের জন্যে ব্যবহৃত হবে বলে রিপোর্টের একটি অংশে উল্লেখ আছে।

GreenMagz: রামপাল নিয়ে যদি কোন সমাধাণ চাওয়া হয় তবে সমাধাণ হিসেবে আপনি কি বলবেন। কেননা আমাদের একদিকে যেমন বিদ্যুৎ দরকার তেমনি সুন্দরবনকেও আমাদের যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে হবে । সেক্ষেত্রে রামপাল প্রজেক্ট বন্ধ করে দেয়াই কি আশু সমাধান ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আমি বলব যে অবশ্যই সুন্দরবনকে বাঁচাতে গেলে রামপাল প্রজেক্ট করা যাবে না। কিন্তু যেহেতু আমাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন সেক্ষেত্রে আমরা ছোট ছোট টাইডাল পাওয়ার প্ল্যান্ট করতে পারি। যেহেতু এই এলাকাটি একটি টাইডাল জোন,আমরা উপকূলীয় উপজেলাগুলিতে ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটের মত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি টাইডাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এর মাধ্যমে। যদিও এই ধরনের পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে কিছু দূষণের আশঙ্কা থেকে যায় কিন্তু তার মাত্রা কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় খুবই কম। পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে এবং এক্ষেত্রে আমরা এটাকে গ্রহণ করতে পারি। আর সরকার যদি কয়লা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করতেই চাই তবে সেটা অন্য কোন জায়গায় করতে পারে যেমন শরীয়তপুর ,মাদারীপুর, বরিশাল, মুন্সিগঞ্জ ইত্যাদি কিন্তু সুন্দরবনের আশেপাশে নয়।

GreenMagz: এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক , আমরা জানি যে ২০০৯ সালে আপনি ‘বাংলাদেশ একাডেমী অফ সায়েন্স’ এর পক্ষ থেকে আপনার গবেষণাকর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘একাডেমী গোল্ড মেডেল’ পান। এজন্যে GreenMagz.info এর পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর আপনার অনুভূতি কি ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আমি মনে করি এ ধরনের পদক বা স্বীকৃতি মানুষকে সামাজ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দেয়। আগে যেমন আমি অনেক বেশী কাজ করতাম নিজের জ্ঞান আহরন বা নিজের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ত দিয়ে কিন্তু এখন দেশের প্রতি, জাতির প্রতি আমার দায়বদ্ধতা অনেক বেশী বলে বিশ্বাস করি । তারই একটি অংশ হিসেবে রামপাল নিয়ে আমার এই ইআইএ স্টাডিটা করা।

GreenMagz: আপনার বর্তমান গবেষণাকর্ম সম্পর্কে যদি আমাদের বলতেন ।

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: বর্তমানে আমি সাউথ-ওয়েস্ট কোস্টাল বেল্টের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন,পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে তাদের খাপ খাইয়ে নেওয়া,দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী ঝুঁকি কমিয়ে মানুষ কিভাবে সহজ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে এ বিষয়ে কাজ করছি। এব্যাপারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সংস্থার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়া সিডরের পর পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও বড়গুনাতে যে বেড়ীবাঁধগুলি ভেঙ্গে গিয়েছিল,সেগুলির পুনর্বাসন ও মেরামতের জন্যে নেওয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের সঙ্গে একজন এনভায়রনমেন্টাল এক্সপার্ট হিসেবে দীর্ঘ চার বছর ধরে কাজ করছি। সম্প্রতি ঝিনাইদহে মারজাত বাউর অঞ্চলের ইকোলজিকাল ক্রিটিকাল এরিয়াতে একটি স্টাডি করছি।

GreenMagz: বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক তরুণ শিক্ষার্থী গবেষণা কাজে আগ্রহী হয়ে উঠছে ।একজন সফল গবেষক হিসেবে আপনি তাদেরকে কি পরামর্শ দিতে চান ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আসলে এখনও আমি নিজেকে ঠিক সফল গবেষক হিসেবে দাবি করতে চাইনা । আমি মনে করি আমার এখনও অনেক জানার আছে,। আমি কাজ করি নিজের শেখার জন্যে এবং এর মাধ্যমে যদি কিছু মানুষের উপকার হয় সেদিকটা নিয়ে ভাবি। বর্তমানে সারাবিশ্বে শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে মানুষ পরিবেশ নিয়ে যতটা সচেতন তেমনটা আগে ছিল না। মাইক্রো ক্লাইমেটিক চেঞ্জ নিয়ে আরও গবেষণা দরকার কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে তার প্রভাব মূলত আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলির মানুষদেরকেই ভোগ করতে হচ্ছে। আমি আশা করব পরিবেশ নিয়ে যে সকল তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন তারা এ ব্যপারটাকে গুরুত্ব দিবেন যাতে করে আমরা মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়কে কমিয়ে আনতে পারি।

GreenMagz: বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্রে কি কি অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় বলে আপনি মনে করেন ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আমি যেহেতু শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত আছি তাই আমাকে শিক্ষা এবং গবেষণাকর্মগুলি একাডেমিক কাজের পাশাপাশি করতে হয়। আমরা যেহেতু উপকূলীয় প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতে কাজ করি সেক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা একটা সমস্যা। যদিও বলা হচ্ছে যে আমাদের পরিবেশ সেক্টরে এখন অনেক অনুদান বা ফাণ্ড আসছে । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এই সকল ফান্ড পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রভাব খুব দৃষ্টিকটু ভাবে কাজ করে । কিন্তু কোন ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা আমার পক্ষে নেয়া সম্ভব নয়, এ ব্যাপারটা সব সময় আমি এরিয়ে চলতে চেষ্টা করি। এমনও দেখা যায় আমি কোন প্রজেক্ট মন্ত্রনালয়ে জমা দেওয়ার পর তা গ্রহণ করা হয় , কিন্তু কোন ফান্ড দেওয়া হয় না। পরবর্তীতে দেখা যায় যে অন্য কেউ আমার সেই প্রজেক্ট নিজের নামে জমা দিয়ে ফান্ড নিয়ে নিচ্ছে। এ ব্যপারগুলি খুবই পীড়াদায়ক।

GreenMagz: আপনি তো অনেকদিন ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশের কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে বেশী ভাবায় এবং সবচেয়ে বেশী আশাবাদী করে ?

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আমি আশাবাদী এই কারনে যে মানুষ এখন পরিবেশকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে । পরিবেশকে জানা এবং বোঝার যে জ্ঞান তা ভবিষ্যতে মানুষকে এই প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া , পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সর্বোপরি পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে সহযোগিতা করবে। বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে এই ব্যাপারটা আমরা সফলভাবে করতে পারি। আর খারাপ লাগার দিকটা হচ্ছে এরকম আমরা একদিকে কিছু কিছু জায়গায় পরিবেশ সংরক্ষণের কথা বলছি আবার ঠিক আমরাই শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থের লাভের জন্য পরিবেশকে বিপন্ন করে কিছু প্রকল্প হাতে নিচ্ছি । এভাবে যদি আমরা পরিবেশের কথা চিন্তা না করে এধরনের প্রকল্প চালিয়ে যেতে থাকি তবে একসময় আমাদের কারনেই আমদের এই পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে, যখন হয়ত একে বাঁচানোর আর উপায় থাকবে না।

GreenMagz: সব শেষে Greenmagz.info এর পক্ষ থেকে রামপাল এবং সুন্দরবন ইস্যুতে একটি সময়োপযগী গবেষণাকর্ম এবং তার ফলাফল সম্পর্কে আমাদের অবিহিত করায় আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি ।

ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ , আপনাদের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা উত্তরোত্তর আরও বৃদ্ধি পাবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

Written By
More from admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *