শেকড়হীন মানুষের কথা

নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হয় এত সুন্দর একটি দেশে জন্মেছি বলে। এত সবুজ বোধহয় পৃথিবীর কোথাও নেই। যেদিকে তাকাই চোখ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় সবার পক্ষে এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব হয় না। এই সুন্দর প্রকৃতিই অনেক সময় তাদের জীবনেও বয়ে আনে অপরিসীম দুর্ভোগ।

যখন থেকে বুঝতে শিখেছি এই দুর্ভাগ্য পীড়িত মানুষগুলো আমাকে খুব ভাবাত। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিও পর যখন অক্সফাম জিবি- এর সাথে এই দুর্যোগ পীড়িত মানুষগুলোকে নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলাম তখন কোনভাবেই সুযোগটা হারালাম না। প্রায় ২ বছর এই মানুষগুলোর সাথে কাজ করেছি, তাদের কাছে গিয়েছি। তেমনিই একজন পদ্মপুকুর, শ্যামনগর, সাতক্ষীরার আইলা বিধ্বস্ত হাসিনা বেগম। সে তার দুর্ভাগ্যের বর্ণনা দিয়েছিল ঠিক এভাবে-

….দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি গিয়ে দেখি, উঠোনে পানি চলে এসেছে। …আমার মেয়েটাকে আগে নৌকায় তুলে দিয়ে… ঘরে ধান ছিল, তুলতে পারি নাই। তার আগেই পানি উঠে গেল।…নৌকায় ছিলাম সাত দিন। ৭ বছরের বাচ্চাটার কষ্ট দেখা যেত না। কতো লাশ ভেসে গেছে নৌকার পাশ দিয়ে …সাতদিন পর আর কোন উপায়ান্তর না দেখে খুলনা শহরের রায়ের মহলে চলে আসি। মাসে ২৫০ টাকা ঘর ভাড়া দিতে হয়। …আমার স্বামী গত তিন সপ্তাহ টাইফয়েড জ্বও হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। আধকিলোমিটারের বেশী দূর থেকে কলের পানি এনে গোসল, খাওয়া, রান্নাবান্নায় ব্যবহার করতে হয়।

একটা টয়লেট আছে তা ৪০-৪৫ জন ব্যবহার করি। সকাল হলেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পুরুষদের মাঝে লাইন দিয়ে দাঁড়াতে লজ্জা করে তাই রাত্রে টয়লেটে যাই।…এর মধ্যে একবার গ্রামে গিয়েছিলাম, কিন্তু লিস্টে আমাদেও নাম নেই বলে ত্রাণ পাই নি। এখন স্বামী বিছানায়, বাধ্য হয়ে আমি অন্যের ক্ষেতে দিনমজুরি করি। যা হয় তাতে একবেলাও খাওয়া যায় না। ছেলেটা ৭ মাস স্কুলে যায় না , একটা চায়ের দোকানে কাজ করছে। তা না হলে খাবে কি? ওর পড়াশোনা কোথায় হবে, কিভাবে হবে জানি না ….
(৯ ডিসেম্বর, ২০০৯)

এভাবেই আইলা নামক প্রকৃতির লীলাখেলায় নিঃস্ব হয়ে গেছে হাসিনা বেগম ও তার পরিবার। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে আইলা, সিডর, নার্গিস, লায়লার প্রভাবে গৃহহীন, নিঃস্ব হওয়ার গল্পের শেষ নেই।

এ তো শুধু এক হাসিনা বেগমের কাহিনী। এমন অসংখ্য হাসিনা বেগম আছেন যাদের গল্প আমাদের অজানা। শুধু ত্রাণ দিয়েই আমরা আমাদেও দায়িত্ব এড়াতে পারি না।আর এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। এই দায়িত্ববোধটুকু ব্যক্তি পর্যায়ে থাকা উচিত। এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকাটা যে কতটা চ্যালেঞ্জিং সেটা দূর থেকে কল্পনা করা যাবে না। কিন্তু কাছে গেলে অনুভব করতে বাধ্য। আমরা যদি আমাদের অবসর সময়ে কোন দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যাওয়ার পাশাপাশি এই ভাগ্য বঞ্চিত মানুষগুলোর কাছে যাই, তাদের কথা, কষ্ট, চাওয়া-পাওয়া গুলো শুনি তাহলে আমরা বোধহয় প্রত্যেকে যার যার জায়গা থেকে তাদেও পাশে দাঁড়াতে পারব। আর এগিয়ে যেতে পারব আমাদেও স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার পথে।

More from Ayesha Sultana Asha

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *