ভারতের জ্বালানী নিরাপত্তা ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়নের বা সমৃদ্ধির জন্য বিদ্যুতের বিকল্প নেই। বিদ্যুৎহীন জাতি অন্ধকারাচ্ছন্ন। কৃষ্টি কালচার সবদিক দিয়েই বিদ্যুতের অভাবে একটা জাতিকে পিছিয়ে পড়তে হয়। পাশ্ববর্তী দেশ ভারত ক্রমশই উন্নতির শিখরে ও বিশ্বের প্রভাবশালী দেশে পরিগণিত হওয়ার এক লড়াইয়ে অবতীর্ন। কিন্তু ভারতের বর্তমান জ্বালানীর হিসেব করলে মাঝপথেই সবকিছু কেমন জানি গোলমেলে হয়ে যায় । এর কারণ ভারতের বিদ্যমান জ্বালানীর চেহারাটা খুব একটা সুবিধার নয় । যা এশীয় অঞ্চলের মানুষদেরকে খুশী করতে পারে। প্রাকৃতিক কয়লা সমৃদ্ধ দেশ ভারত। ভারতের কয়লার মজুদ পৃথিবীর বৃহত্তম মজুদগুলোর চাইতেও অগ্রগন্য। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল ভারতের গোটা অর্থনীতি, মধ্যবিত্ত জীবন, শিল্পকারখানা ও চলমান দেশজ মোট উৎপাদের গতি। ভারতে কয়লা বাদে প্রাকৃতিক তেল গ্যাসের মজুদ সন্তোষজনক নয় এটা সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু কয়লা মজুদের দিক দিয়ে ভারতের অবস্হান পৃথিবীতে পাঁচ নম্বরে। আর এই কয়লার উপর নির্ভর করে গেল পাঁচ বছরে ভারতে বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে ১৩০ বিলিয়ন ডলারের ও বেশি। আর এই বিনিয়োগের ৬০ ভাগই হয়েছে ভারতের বণিকদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ।

তারপরও ভারতের জ্বালানীর ভবিষ্যৎ গ্রাফে হা করে আছে বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন। অঙ্গরাজ্য, সরকারি অফিস, আদালত, সিটি করপোরেশন, নিয়ন্ত্রন কমিশন, পরিবেশবাদী, সামাজিক সংঘটনসমুহ, দুর্নীতি বিরোধী জোট, আন্না হাজারি, রামদেব প্রকাশ, গ্রাম্য জীবন, মধ্য ও ভারী মানের শিল্পকারখানা, সর্বত্রই বিরাজমান উন্নয়নের আকাঙ্খা ও প্রতিশ্রুতি।

পিক আওয়ারে ভারতের মোট চাহিদার বিপরীতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়েই বর্তমানে ১০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। রয়েছে গ্রিড লাইনের অপর্যাপ্ততা। ৩০ কোটিরও বেশি মানুষকে ভারতে প্রতিদিন বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। অর্থাৎ ৩০০ মিলিয়ন লোকের কাছে ভারত সরকার এখনও বিদ্যুৎই পৌছে দিতে পারেনি।

ভারতের পর্যাপ্ত কয়লার মজুদ থাকা সত্ত্বেও উত্তোলনের হার সন্তোষজনক নয়। এর মূল কারণ হচ্ছে ভারতের কয়লা সেক্টরটা নির্দিষ্ট গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর হাতে বন্দি। যারা নিজেদের মতো করে শিল্পায়ন করতে গিয়ে মনোপলি ব্যবসায় পরিণত করেছে পুরো সেক্টরটাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্যগুলোরও করার কিছুই নেই। কারণ পুরোভারতের রাজনীতিতে এখন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের প্রভাব সর্বত্র। ভারতের বৃহত্তম কয়লা মজুদ থেকে ১৯৯৮ সাল থেকে অদ্যবধি মাত্র ৬০০ মিলিয়ন টন কয়লার উত্তোলন করা সম্ভব হয়েছে। অতচ একই সময়ে চীনের মোট উত্তোলিত কয়লার পরিমাণ ৩.৫ বিলিয়ন টন। যুক্তরাষ্ট্রের উত্তোলিত কয়লার পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন টন। অস্ট্রেলিয়া উত্তোলন করেছে ৪শত মিলিয়ন টন এবং সাউথ আফ্রিকার মোট উত্তোলনের পরিমান ৩০০ মিলিয়ন টন।

জওহুর লাল নেহেরু, ভারতের রাজনীতির কিংবদন্তি এক মহাপুরুষ। যার হাত ধরে ভারতের স্বাধীনতা এসেছে। মহান এ নেতা ভারত স্বাধীনের পরপরই ঘোষনা করলেন নদীর স্রোতে বাঁধ নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। এবং এই জলবিদ্যুতের আধারই হবে আধুনিক ভারত নির্মানের মুল নিয়ামক। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবেশ সম্মত হওয়ায় জওহর লাল নেহারুর নেয়া এ উদ্যোগ বিশ্বজুড়েই মডেলে পরিগণিত হয়। পৃথিবীর বড় বড় দেশ নেহেরুর ঘোষনার পর জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে মনোযোগ প্রদান করে। অতচ ভারত এ ক্ষেত্রে খুব একটা সফল হতে পারেনি। ১৯৬০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র শতকরা ১৪ ভাগ যোগান দেয়া হচ্ছে জলবিদ্যুৎ থেকে। তবে সম্প্রতি ভারত সরকার মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্হাপনে মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আর উদ্যেগে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কাশ্মির ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভুটানের দিকে। ভারতের জ্বালানী নীতিতে হিমালয়ের ঢলে নেমে আসা জল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্হির করা হয়েছে। তবে এ এগোনাটা এখনো চিন্তাভাবনায় বা ঘোষণা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, মূল নীতিতে এখনো যুক্ত হয়নি।

ভারত উপমহাদেশ জুড়েই সৌরালোক ও বায়ু ব্যবহারের দারুন সুযোগ রয়েছে বলে জ্বালানী বিশেষজ্ঞদের ধারনা। আর এ ধারনা থেকেই গুজরাট ও তামিল নাডুতে নবায়নযোগ্য জ্বালানীর বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজতর করা হয়েছে। কিন্তু এ দুই অঙ্গরাজ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানীর অভুত সুযোগ থাকলেও কৃষকরা তাদের জমি দিচ্ছেনা বলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছেনা।

অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ারের কথা বিবেচনা করলে ভারত এখনো এ সেক্টরে খুব একটা অগ্রসর হতে পারেনি। এর মূল কারণ রাজনৈতিক মতবিরোধ ও বিরোধী গোষ্ঠীর তৎপরতা। যারা কোনমতেই ভারতকে নিউক্লিয়ার পাওয়ারের দিকে ধাবিত হতে দিতে চায়না। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহিত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট করার যে চুক্তি ভারত করেছে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এমন কি এতদ সংক্রান্ত বিষয়ে বন্ধুপ্রতীম দেশ জাপানও সহযোগীতা করতে নারাজ। তবে ভারতে শিল্পবণিকরা চেরোনোবিল দুর্ঘটনা ও সাম্প্রতিক ফুকুশিমা র্দুঘটনাকে আমলে নিতে নারাজ। শিল্পমালিকরা যেকোন উপায়ে ভারতে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের বাস্তবায়ন চায়। কারণটাও স্পষ্ট শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আর সেটা যেকোন উপায়েই আসুক তাতে শিল্পমালিকরা বাধ সাধতে চায়না। কিন্তু ভারত সরকার জনসাধারনের বিরোধিতার কাছে কুলিয়ে উঠতে পারছেনা।

বিদ্যুৎ নিয়ে ভারতের ২০১৭ সাল পর্যন্ত মহাপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। আগামী ২০১৭ সাল নাগাদ মোট ৩৫০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কয়লা থেকে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ২৩০ গিগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ থেকে ৭০ গিগাওয়াট, গ্যাসভিত্তিক উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমান ধরা হয়েছে ২০ গিগাওয়াট, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট থেকে ১০ গিগাওয়াট ও ফসিল ফুয়েল থেকে বাকি ২০ গিগাওয়াট।

ফসিল ফুয়েলের দিক থেকে ভারতের রিজার্ভ খুব একটা আশাপ্রদ নয়। অফশোর এরিয়া ও রাজস্হানে কিছু গ্যাস ও তেলক্ষেত্র রয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্র থেকে উৎপাদনের মাত্রা খুব একটা প্রতিশ্রুতিশীল নয়। তার উপরে চীনের পাইপ লাইনের বিস্তৃতি গোটা মধ্য এশিয়া জুড়ে। ভারতের কয়লার বৃহত্তম মজুদ আছে ঠিকই কিন্তু গুনগত মানের দিকে অত্যন্ত নিম্ন মানের। কারণ ভারতের কয়লাতে প্রচুর পরিমানে এ্যাশ বা ছাই রয়েছে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের কয়লার দিকে নজর পড়ে বৃটিশদের। কয়লা পরিবহনের জন্য বৃটিশরা মাল্টি মিলিয়ন ডলার খরচ করে ট্রেন লাইনের ব্যবস্হা প্রবর্তন করে। পূর্বভারত জুড়েই কয়লা মজুদের আধিক্য। ৩৭৫ হাজার শ্রমিক প্রতিনিয়ত কাজ করছে ভারতের কয়লাক্ষেত্রগুলোতে। অধিকাংশ কয়লাক্ষেত্রই উম্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের চিত্র পরিলক্ষিত। আভ্যন্তরীন ব্যবহারের জন্য উত্তোলিত কয়লার বাজার মূল্য আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের চাইতে অনেক কম হওয়ায় দেশীয় কোম্পানীগুলো এ সেক্টরে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছে। কয়লাখাতকে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়ার পর এ সেক্টর তৃতীয় একক খাতে পরিণত হয়েছে। যার সম্ভাব্যমুল্য ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ভারতের মোট ইক্যুয়িটির ৩৫ ভাগেরও বেশি।

কিন্তু কয়লার এত বড় মজুদ থাকা সত্ত্বেও ভারতের জ্বালানী নিরাপত্তা নিয়ে নানান প্রশ্ন চলে এসেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে কয়লা উত্তোলনের চিত্র খুব একটা উৎসাহপূর্ণ নয়। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতের মোট কয়লা উত্তোলনের যে গ্রাফ তা মোট দেশজ উৎপাদনে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। আগামি ২১০০ সাল পর্যন্ত ভারতের মোট বিদ্যুতের চাহিদা দাড়াবে ৪০০ গিগাওয়াট কিন্তু বর্তমান কয়লা উত্তোলনের হার বিবেচনায় নিলে উত্তোলিত কয়লা দিয়ে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে ১০০ গিগাওয়াট। অতচ আগামী শতক ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। কারণ ভারতকে একদিকে মোকাবিলা করতে হবে দেশজ বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপ্রতুলতা, অন্যদিকে চীনের অগ্রগতি। এ দুই প্রয়াসে ভারত জয়ী হলেই কেবল সম্ভব বিশ্বে প্রভাবশালী রাষ্ট্রে নিজেদের অবস্হান প্রকাশ করা। কিন্তু ভারতের জ্বালানীর চিত্র হতাশাকে ছাপিয়ে এখন পর্যন্ত স্হিতি পজিশনে আসতে পারেনি। যার ফলেই বিশ্বজুড়েই জ্বালানী বিশেষজ্ঞদের উষ্মা প্রকাশ করতে দেখা যায় ভারতের জ্বালানী নিরাপত্তা নিয়ে। আজকের যুগে এটা দিনের আলোর মতোই পরিস্কার যে, জ্বালানী নিরাপত্তা ব্যতীত কোন দেশই প্রভাবশালীর দেশের প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারবেনা। তাই সামনের সময়গুলোতেই ভারতের অবস্হান ও শক্তির ভিত্তি প্রকাশ হবে আভ্যন্তরীন জ্বালানীখাতকে ঘিরে। আর যার দিকে নজর রয়েছে বিশ্বনেতৃবৃন্দের।

Written By
More from Hasan Kamrul

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *